Jobanএখন যে কারণে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে না

এখন যে কারণে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে না

গণতন্ত্রের দাবিতে একটি গণঅভ্যুত্থান’র জন্য প্রয়োজনীয় সকল পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও এখন কেন ১৯৬৯ বা ১৯৯০ সালের মত গণঅভ্যুত্থান ঘটছে না। এই ধরনের গনঅভ্যুত্থান হওয়াকে বর্তমান অবৈধ সরকার কোন প্রক্রিয়ায় ঠেকিয়ে রেখেছেন সেই কারণটি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

যারা ‘দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব দ্য থার্ড রাইখ’ বইটি পড়েছেন, তারা সম্ভবত কারণটি জানেন। তবু সবার সুবিধার্থে বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছি আজকের লেখায়।

মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা কি? এই প্রশ্নের জবাবে কমবেশি সবাই ভুল উত্তরই দিয়ে থাকেন— অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থান। কিন্তু মনে করুন, যদি আমি আপনাকে দু’টি বিকল্প প্রস্তাব দেই— আপনাকে সাতদিন না খাইয়ে রাখবো, অথবা এখনই আপনাকে মেরে ফেলবো। তাহলে আপনি কোন বিকল্পটি বেছে নেবেন? আপনি নিশ্চয়ই মরে যেতে চাইবেন না, তাই সাত দিন না খেয়ে হলেও বেঁচে থাকার বিকল্প প্রস্তাবটিই আপনি বেছে নিবেন। বেঁচে থাকার চাহিদা পূরণ হলে তারপরে আপনি খাবারের চিন্তা করবেন, এরপর লজ্জা নিবারণের চিন্তা করবেন, তারপর আসবে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের চিন্তা। এই সব চাহিদা পূরণ হবার পর আপনার মাথায় হয়তো আসবে চিকিৎসা এবং শিক্ষার চিন্তা। গণতন্ত্র বা ভোটের চিন্তা এবং উন্নয়ন কিংবা বিনোদনের চিন্তা আসবে আরও অনেক পরে।

একজন মানুষ নিজ দেশে অত্যাচার, অনাচার, অবিচার এবং স্বৈরাচার হয়েও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছেন এমন উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে।

 

ব্রিটিশ বিরোধী ‘আজাদী আন্দোলন’ এবং ১৯৬৯ বা ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন যখন হয়েছিল, তখনকার ঔপনিবেশিক, দখলদার বা স্বৈরাচারী সরকারও মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো বজায় রেখেছিল। মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতো। হঠাৎ করে রাতের আঁধারে কড়া নেড়ে কাউকে তুলে নিয়ে গুম করা হতো না, সাজানো বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হতো না। সেই সময় মিছিলে গুলি হতো, গুলিতে হয়তো কোন আন্দোলনকারী নিহত হত, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আরও বড় আন্দোলন দানা বাঁধত এবং পত্রপত্রিকায় সেই মিছিলে গুলির ঘটনা ব্যানার হেডলাইন দিয়ে প্রচার করে সরকারের বিরুদ্ধে আরো বড় জনমত তৈরি করা হতো। আপনি চাইলে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, ৬৯’র মিছিলে গুলি করে আসাদকে হত্যা, ৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে হত্যা, এবং ৯০ সালে ডাক্তার মিলনকে গুলি করে হত্যার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করতে পারেন। কিন্তু হিটলার বেছে নিয়েছিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতি। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও তিনি হয়ে উঠেছিলেন হিংস্র স্বৈরাচারী। নির্মমভাবে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে দিয়েছিলেন। গেস্টাপো এবং এসএস বাহিনীর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছিলেন। হিটলার বিরোধীরা সর্বক্ষণ আতঙ্কে থাকতেন, তখন তাকে গেস্টাপোরা এসে তুলে নিয়ে যাবে এবং চিরতরে গুম করে দেবে। নিজের স্বৈরশাসনকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হিটলার ও উন্নয়ন এবং থার্ড রাইখের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন জার্মান জাতিকে। (বৃহত্তর রোমান সাম্রাজ্য কে বলা হয় প্রথম রাইখ এবং বিসমার্কের জার্মান সাম্রাজ্যকে বলা হয় দ্বিতীয় রাইখ)। রোমানদের আদলে হিটলার বিশাল বিশাল ভবন তৈরি করেছিলেন, বিশাল সামরিক বাহিনী, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, বৃহৎ কামান, ট্যাংক ইত্যাদি তৈরি করেছিলেন।

অন্যদিকে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যে যারা হিটলার বিরোধী ছিল তাদের এবং ইহুদি সম্প্রদায়কে গেস্টাপো বাহিনী দিয়ে নির্মমভাবে নির্মূল করতে শুরু করেছিলেন।

তারপরও কিন্তু হিটলার আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে তিনি বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ‘পারসন অফ দা ইয়ার’ হিসাবে কভার ফটোতে স্থান পেয়েছিলেন। হিটলারের নাৎসি স্যালুট এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, ব্রিটিশ রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড এবং বর্তমান রানী কুইন এলিজাবেথকেও সেই সময়ের একটি ভিডিওতে নাৎসি স্যালুট দিতে দেখা গেছে [https://youtu.be/OB0YAVF-eOI]। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, একজন মানুষ নিজ দেশে অত্যাচার, অনাচার, অবিচার এবং স্বৈরাচার হয়েও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতি পেয়েছেন এমন উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে।

বাংলাদেশেও এখন সেই হিটলারের জার্মানির অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধী মতকে নির্মূল করার জন্য বিনা বিচারে হত্যা এবং গুম করার মতো ভয়াবহ অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখন নেমেছে গেস্টাপোর ভূমিকায়। হিটলারের ছিল মাত্র একজন প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার গোয়েবলস। বাংলাদেশের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার হাসান মাহমুদ’র বাইরে ও সরকারপন্থী সাংবাদিক নেতারা নিজেরাই একেকজন জোসেফ গোয়েবলস’র ভূমিকায় নেমেছেন। ফলে বিরোধী দল মতের উপর এই হত্যা-গুম দমন-নিপীড়নের খবর পত্র-পত্রিকায় আসার কোনো উপায় নেই।

 

হিটলার যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু না করতেন, তাহলে এত বড় স্বৈরাচার হয়েও তিনি হয়তো আরেক স্বৈরাচার স্ট্যালিনের মতোই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারতেন। উল্লেখ্য যে, জোসেফ স্ট্যালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নে তার বিরোধীদের হিটলারের মতোই নির্মমভাবে হত্যা করতেন কিংবা সাইবেরিয়ায় লেবার ক্যাম্প এ পাঠিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতেন। বাংলাদেশেও এখন সেই হিটলারের জার্মানির অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধী মতকে নির্মূল করার জন্য বিনা বিচারে হত্যা এবং গুম করার মতো ভয়াবহ অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এখন নেমেছে গেস্টাপোর ভূমিকায়। হিটলারের ছিল মাত্র একজন প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার গোয়েবলস। বাংলাদেশের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার হাসান মাহমুদ’র বাইরে ও সরকারপন্থী সাংবাদিক নেতারা নিজেরাই একেকজন জোসেফ গোয়েবলস’র ভূমিকায় নেমেছেন। ফলে বিরোধী দল মতের উপর এই হত্যা-গুম দমন-নিপীড়নের খবর পত্র-পত্রিকায় আসার কোনো উপায় নেই।

বিকল্প মিডিয়া হিসাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই লেখালেখি করে সরকারের এসব অন্যায় অত্যাচার দুর্নীতি-দুঃশাসনের প্রমাণ উপস্থাপন করতেন। যারা দেশে বসেই এমন লেখালেখি করতেন, তাদের এই বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখিগুলোকে গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করে একের পর এক গ্রেপ্তার করে অকথ্য নির্যাতন করা হচ্ছে এবং কুখ্যাত ৫৭ ধারা ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা দিয়ে জেলে পুরে রাখা হয়েছে। (অথচ গুজব প্রচার এর কারণে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত অনেকগুলো পেজ এবং প্রোফাইল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।)

এমনকি যারা দেশের বাইরে বসে লেখালেখি করেন তারাও হুমকির মুখে। দেশে অবস্থিত তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়মিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যকে গ্রেফতার করে তার মাথায় পিস্তল ধরে দেশের বাইরে থাকা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে ফোন করিয়ে তার কাছ থেকে ফেসবুকের আইডি এবং পাসওয়ার্ড নেওয়া হয়েছে, এমন ঘটনাও আছে। কাজেই যে দেশে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তাই নেই, সেখানে প্রতিদিন নিজেকে জীবিত অবস্থায় দেখাই এখন সবচেয়ে বড় পাওয়া। এমন অবস্থায় গণতন্ত্রের জন্য চিন্তা করা কিংবা ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা সাধারণ মানুষের জন্য খুবই কঠিন একটা কাজ।

সাধারণ মানুষের এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা সে বেঁচে থাকবে তো? রাতের বেলা তাকে কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে গুম বা মাদক ব্যবসায়ী অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হবে না তো? শাহজাহান খানের লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভারদের গাড়ি তার জীবন কেড়ে নেবে না তো? নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী তার একটা কর্মসংস্থান হবে তো, যাতে সে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারে? কর্মক্ষেত্রে সে সঠিক বেতনটা পাবে তো, যাতে তার সংসার কোনমতে টিকে থাকতে পারে?

যারা প্রতিনিয়ত নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, দু’মুঠো খাবারের জোগাড় কিভাবে হবে সেটা নিয়ে চিন্তিত, তাদের কাছে ভোট বিপ্লব বা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আশা করা ভুল রাজনীতি। রাজনীতিবিদরা এমন আশা করার আগে অবশ্যই পর্যালোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন যে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার দেশের মানুষকে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে!

 

সরকারের হত্যা-গুম দুর্নীতি-দুঃশাসন নিয়ে সাধারণ মানুষ অবশ্যই ক্ষুব্ধ। শেয়ার বাজার এবং ব্যাংক গুলো থেকে লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া নিয়ে তাদেরও কষ্ট আছে। রডের বদলে বাঁশ দিয়ে উন্নয়নের মহাসড়ক তৈরি করা কিংবা নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি করা ফ্লাইওভার ধ্বসে মানুষ নিহত হয় তারাও ব্যথা পায়। কিন্তু নিজেদের জীবন বিপন্ন হয়ে যাওয়ার ভয়ে; গুম-হত্যার শিকার হবার আশঙ্কায় তারা কিছু বলতে পারে না। তাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে এই সাধারণ মানুষরা অংশ নিতে পারে না। যারা প্রতিনিয়ত নিজের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত, দু’মুঠো খাবারের জোগাড় কিভাবে হবে সেটা নিয়ে চিন্তিত, তাদের কাছে ভোট বিপ্লব বা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আশা করা ভুল রাজনীতি। রাজনীতিবিদরা এমন আশা করার আগে অবশ্যই পর্যালোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন যে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার দেশের মানুষকে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে! কেমন ভাবে তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। সুতরাং সর্বপ্রথম দেশের সাধারণ মানুষের এই বেঁচে থাকার অধিকারগুলোর প্রতি রাজনীতিবিদদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।

তাছাড়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অবস্থাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আমি নিজে ৯০’র গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি। সেই সময় আমাদের সর্বোচ্চ আশঙ্কা ছিল আরিচা রোডে মিছিল করার সময় পুলিশ সরাসরি গুলি না করে দেয়! না, স্বৈরাচারী এরশাদের আমলেও পুলিশ কখনোই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর সরাসরি গুলি করেনি। তারা টিয়ারসেল নিক্ষেপ করতো এবং ফাঁকা গুলি করে আমাদের ছত্রভঙ্গ করতো। মাঝেমধ্যে তারা আমাদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করতো। কিন্তু আমাদেরকে পুলিশের গাড়িতে তোলার পরে এমন আন্দোলন শুরু হতো যে অনেক সময় গাড়ি থেকে আমাদের ছেড়ে দিত। কখনো কখনো থানাতে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিত। খুব বেশি হলে, একটা মামলা দিয়ে পরের দিন আদালতে পাঠিয়ে দিত, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই জামিন নিয়ে বের হয়ে আসা যেত। মামলা নিয়ে গারদে যাওয়া বা জেলে যাওয়াটাই ছিলো সেই সময় আন্দোলনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।

এখন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে উপস্থাপিত হওয়ার জন্য কয়েক লাখ টাকা ঘুষ দিতে প্রস্তুত থাকেন। তারা এটা ভেবে স্বস্তি অনুভব করেন— যাক বেঁচে তো আছি! গুম তো হয়ে যাইনি! মিথ্যা ক্রসফায়ারে নিহত তো হইনি! রাতের আধারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর আত্মীয়-স্বজনরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরের দিন আদালতে হাজির করা হয়।

প্রায় লাখখানেক মিথ্যা এবং ভুতুড়ে মামলায় পাঁচ লক্ষাধিক বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী হয় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, নয়তো জেলে আটক আছেন। আমার পরিচিত এক রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে জেলে আটক আছেন। গত নভেম্বরে তার বিরুদ্ধে যে ভৌতিক মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি না করা হলে তিনি জামিন নিতে পারছেন না। এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার জন্য প্রতিটি মামলাপিছু ২০ হাজার টাকা করে দাবি করেছে থানার এসআই। এমন হাজার হাজার ঘটনা আছে। এমন লক্ষ লক্ষ বিপন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দিয়ে কিভাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন করা সম্ভব? তাদের তো এখন জীবন নিয়ে বেঁচে থাকাই মুশকিল, গণতন্ত্র নিয়ে চিন্তা করার সময় টা কোথায়?

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে এই অমানবিক আগ্রাসন চালাচ্ছে সৌদি আরবের সেনাবাহিনী। শেখ হাসিনা এই আগ্রাসনে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ থেকে দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনে প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের। হয়তো সৌদি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও শেখ হাসিনা একটা বোঝাপড়ায় উপনীত হতে পারবেন। পৃথিবীর ক্ষমতাবান মানুষদের তালিকায় ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনা নিজের স্থান করে নিয়েছেন। খুব শীঘ্রই টাইম ম্যাগাজিনের ‘পারসন অফ দা ইয়ার’ হিসাবে কভার ফটোতে স্থান নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

 

নিজ দেশের মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে অনিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মহলে শেখ হাসিনা অবশ্য মোটামুটি ভালোই আছেন। গত ৩০ শে ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে একটি প্রহসন করার পরও তার ওপর ভারত, চীন এবং রাশিয়ার আশির্বাদ রয়েছে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় নির্মম এবং অমানবিক হত্যাযজ্ঞ চলছে ইয়েমেনে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে এই অমানবিক আগ্রাসন চালাচ্ছে সৌদি আরবের সেনাবাহিনী। শেখ হাসিনা এই আগ্রাসনে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ থেকে দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনে প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের। হয়তো সৌদি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথেও শেখ হাসিনা একটা বোঝাপড়ায় উপনীত হতে পারবেন। পৃথিবীর ক্ষমতাবান মানুষদের তালিকায় ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনা নিজের স্থান করে নিয়েছেন। খুব শীঘ্রই টাইম ম্যাগাজিনের ‘পারসন অফ দা ইয়ার’ হিসাবে কভার ফটোতে স্থান নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

গ্রামদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে— স্ত্রীর বিনিময়ে যদি কারো সাথে বন্ধুত্ব করা হয় তাহলে সেই বন্ধুত্ব থেকে অনেক কিছুই পাওয়া যায়; সেই বন্ধুত্বের স্থায়িত্বও অনেক দীর্ঘ হয়। ভারতের সাথে শেখ হাসিনা নিজ দেশের বিনিময় বন্ধুত্ব করেছেন। ভারতের বিগত হাই কমিশনার চলে যাওয়ার আগে জানিয়েছেন তার আমলে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে অনেকগুলো সফল চুক্তি করেছেন। বাংলাদেশের জনগণ এখনো জানে না, সে সব চুক্তিতে কি রয়েছে। আমি কেবল একটি সামরিক চুক্তির কথা বলি, যেটা মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে। ভারত সরকার যদি মনে করে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত বিরোধী কোনো গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, তাহলে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সরকারের বিনা অনুমতিতেই সেই ভারত বিরোধী গোষ্ঠীকে দমন করার জন্য বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে প্রবেশ করতে এবং অভিযান চালাতে পারবে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এই ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবে।

এখন মনে করুন সুন্দরবনের পাশে ভারতের নির্মিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আন্দোলন’র মত সহিংস কোন আন্দোলন গড়ে তোলা হল। ভারত সরকার যদি এই আন্দোলনকে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে তারা রামপাল বিরোধী আন্দোলনকারীদের দমন করার জন্য সেনাবাহিনী পাঠাতে পারবে এবং বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ভারতের সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবে।

সীমান্ত হত্যা বিষয়ে ও ভারতের সাথে একই ধরনের চুক্তি রয়েছে। খেয়াল করে দেখতে পারেন, কিছুদিন আগে ভারতীয় বিএসএফের কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে একজন বাংলাদেশিকে গুলি করেছিল। এক পর্যায়ে সীমান্তবর্তী এলাকার বাংলাদেশি জনগণের প্রতিরোধের মুখে এক বিএসএফ সদস্য তার অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সসম্মানে সেই অস্ত্রটি ফেরত দিয়ে আসে। অথচ বিএসএফের গুলিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির প্রধান বলেছেন— বাংলাদেশের ওই লোক চুরি করতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে এবং এটা একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

বাংলাদেশের প্রায় তিন দিন ঘিরে রেখেছে ভারত। গত ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভোট ডাকাতি করার ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান শশী ভূষণ সিং তমার সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে সাউথ এশিয়া মনিটর’র নির্বাহী সম্পাদক চন্দন নন্দী জানিয়েছেন। একটি দেশের তিন দিক ঘিরে রাখা অন্য একটি দেশ যখন সেই দেশ থেকে নিজের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি স্বৈরাচারী সরকারকে যেন তেন ভাবে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর হয় তখন সেটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তাহলে কি এই স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্তির কোন আশাই নেই? জোসেফ স্ট্যালিন মতোই কি তিনি আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

তবে আমার কাছে কিছু পেছনের এবং সাম্প্রতিক ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দাবিতে গত বছর সাধারণ ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছিল। তাদের আন্দোলন এতটাই জনসমর্থন পেয়েছিল এবং তীব্র হয়েছিল যে সরকার শেষ পর্যন্ত চাকরিতে কোটা ব্যবস্থাই তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল।

শাহজাহান খানের লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার এর হাতে দুই জন স্কুল ছাত্রের মৃত্যুর প্রতিবাদে সারা দেশের স্কুলের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল। তাদের আন্দোলনও ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছিল এবং সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।

কিছুদিন আগে ন্যায্য বেতন ভাতার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। সরকারের মিডিয়া সেন্সর’র পরও যতটুকু খবর পাওয়া গেছে, তাতে রাজধানীর আশেপাশে বেশ কয়েকটি এলাকা অচল হয়ে গিয়েছিল।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য চাহিদার দাবিতে মানুষ আন্দোলন করতে প্রস্তুত এবং রাস্তায় নামতে প্রস্তুত।

অদ্ভুত হলেও সত্য যে, প্রধান বিরোধী দল উপরের এই আন্দোলগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনকারীদের সাথে রাজপথে নেমে আসেনি।

মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কে অনিশ্চিত করে দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঠেকানোর যে কৌশল বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার গ্রহণ করেছে সেই কৌশল মোকাবেলা করতে হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন এবং নিরপেক্ষ ভোটের আন্দোলন বাদ দিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার এবং মৌলিক চাহিদার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের পর যে কোন মৌলিক চাহিদার আন্দোলনে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের রূপান্তর করতে হবে।

 

আমাদের বুঝতে হবে— আমরা যদি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার আন্দোলনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে না পারি, তাহলে তারা কেন আমাদেরকে আপন ভাববে? আর তারা যদি আমাদেরকে তাদের আপনজন না ভাবে, তাহলে আমরা কিভাবে তাদেরকে বোঝাতে পারব যে- এই যে মানুষের জীবনের এবং মৌলিক চাহিদাগুলোর অনিশ্চয়তা, এগুলোর জন্য কেবলমাত্র এবং একমাত্র দায়ী একটি স্বৈরাচারী সরকারের স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে না পারলে মানুষের জীবনের নিশ্চয়তাও ফিরে পাওয়া যাবে না, আর মৌলিক চাহিদাগুলোর অনিশ্চয়তাও দূর হবে না। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার কে অনিশ্চিত করে দিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঠেকানোর যে কৌশল বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার গ্রহণ করেছে সেই কৌশল মোকাবেলা করতে হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন এবং নিরপেক্ষ ভোটের আন্দোলন বাদ দিয়ে মানুষের বেঁচে থাকার এবং মৌলিক চাহিদার আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এর মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের পর যে কোন মৌলিক চাহিদার আন্দোলনে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের রূপান্তর করতে হবে।

অন্যদিকে একটি গণঅভ্যুত্থানের জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা জনগণকে ঐক্যবন্ধ করে সব ভয়-ভীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নামানো সম্ভব তেমন কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ জনগণের সামনে পরিস্কার হয়ে ওঠে নি। যে অতীতে সব দল দেশ শাসন করেছে তাদের রাজনৈতিক অনেক শুভ তৎপরতা থকালেও এই ধরণের ফ্যাসিবাদি রাজনৈতিক শাসনের বাইরে তাদের বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা খুব শক্ত ভাবে সমাজে প্রসারিত করা যায় নি। এটাও গণঅভ্যূত্থান না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। কে না জানে আদর্শ’র জন্য মানুষ জীবন বিসর্জন নিতে দ্বিধা করেন না।

তারপর যেসব বিদেশি শক্তি এই দেশের জনগণকে চুষে খাওয়ার বিনিময় এই স্বৈরাচার সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে, জনগনকে সাথে নিয়ে সেসব বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধে নামতে হবে। আপামর জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এমন একটি বিদেশি শক্তি নেপালে পরাজিত হয়েছে, ভুটানে পরাজিত হয়েছে, মালদ্বীপে পরাজিত হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় পরাজিত হয়েছে, ইনশাআল্লাহ তারা বাংলাদেশেও পরাজিত হবে। একটি দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে শত্রু বানিয়ে রেখে তারা কিভাবে সেই দেশের ভেতর দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করাবে? এ বিষয়গুলো যদি ওই বিদেশি শক্তির শীর্ষ কর্মকর্তারা বিবেচনায় নিয়ে তাদের তাবেদার সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সরানোর ব্যবস্থা করে, তাহলে সেটাই হতো সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু এমন সুন্দর শান্তির পথ বেছে নেওয়ার মতো বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ঐ দেশে আছে কি?