Jobanঅভিজিৎ রায়’র গুচ্ছ কবিতা

অভিজিৎ রায়’র গুচ্ছ কবিতা

কথার কথা

 

অনেক কথায় ফাঁক থেকে যায়

ফাঁক রেখে দিই অনেক কথায়;

ব্যথার শোকে ব্যথা ভুলি

সুখ ভুলে যাই শোকের কথায়।

 

ভরসা রাখি মুখের কথায়

কথার কথায় যন্ত্রণা পাই;

কথার হিসেব কথাই রাখে

কথার শত্রু নীরবতাই।

 

কথার আগে একটু ভাবো

মৌনতাকে সঙ্গ দিতে

ভাবনা জুড়ে আকাশ রাখো

পারবে নদী সঙ্গে নিতে?

 

নদীর কথা আকাশ শোনে

পাহাড় শোনে নদীর কথা,

পথের কথা মেঘ শুনেছে

বৃষ্টি শোনে ঝড়ের কথা।

 

মাটির বিষে ধানের কথা

পাগল করে হাওয়ার শিষে,

কথায় কথায় যাচ্ছি মরে

কারও কথার মারণ বিষে।

 

লাভ-ক্ষতি

 

ইচ্ছে করেই চশমা খুলে রেখে

চোখের উপর চোখ রেখেছি তোমার

হাতের উপর হাত রেখেছি, আরও

স্পর্শে লোভ অনেকখানি ক্ষমার।

 

অযত্ন আজ জমছে ঘরের কোণে

যত্ন করে বলার কথাগুলো

মেঘ সরিয়ে চাদর ঝেড়ে দেখে

বিছানা জুড়ে অনুতাপের ধুলো।

 

আজকে তোমায় সামনে পেয়েই আমি

ইচ্ছে করেই বোতাম রাখি খুলে

বুকের ছবির হদিশ রাখো না যে

হাতটা বুলাই খুস্কি মাথার চুলে।

 

বোতাম খোলার ইচ্ছেটুকু বুঝি

হারিয়ে যেতে শান্ত হয়ে বসে;

শোকের সুখে ঘুম আসে না রাতে

দুই চোখ লাভের, ক্ষতির অঙ্ক কষে।

 

অনুপ্রাসের জীবন

 

যেখানে মৃতের পাশে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে

চুপ করে বসে থাকে মৃতের স্বজন

সেখানে জীবন থামে- এই ধারণা ভুল

সম্পর্কের পরজন্মে বেড়ে ওঠে ভ্রূণ।

 

যেখানে রোগীর পাশে শুভেচ্ছার ফল

শুয়ে থেকে, বসে থেকে গুনেছে প্রহর;

সেখানে মনোবল বেড়ে যেতে  থাকে

শুভেচ্ছা প্রার্থনা করে তোমার শহর।

 

অবরোধে রাস্তা থামে, জন্মের কাহিনি

পরজন্মে লেখা হয় শোকের সন্ত্রাস;

শব্দে কেউ জেগে ওঠে, ঘুম আসে কারও

জীবনের মায়া ছুঁয়ে মোহে অনুপ্রাস।

 

ভাঙা সাঁকোর পূর্ণিমা

 

অচেনা কাহিনি দিয়ে শুরু করি কথোপকথন

যে কথা বলার ছিল তার সাঁকো ভেঙে পড়ে যায়

গল্পের বারান্দা থেকে মৃত্যুশোক পথে অসহায়

কাহিনির চাঁদ বুঝি একা সারে মেকি আলাপন!

 

রাতের আকাশ জুড়ে সঙ্গীহীন তারাদের ভিড়,

পুকুরের জলে চাঁদ সহবাসে মেতেছে যখন

বিছানা রক্তের দাগে ছবি আঁকে প্রেম অমলিন;

তখন সাঁকোর মুখে প্যাঁচারাই দেখেছিল চিড়।

 

মরা গাছ নুড়িদের গল্প বলে অচেনা সঙ্গীতে,

কাহিনির ভাঙা সাঁকো খুঁজে যায় মিঠে নদীজল;

জোছনায় বানভাসি সাঁকো আর নদীর সম্বল

কাহিনি কবিতা লেখে নুড়িদের সুধা শুষে নিতে।

 

গল্পের বারান্দা থেকে ভাঙা সাঁকো হেঁটে চলে যায়

চেনা কাহিনিরা আজ চাঁদ খুঁজে চুমু খেতে চায়!

 

ঋণগ্রস্ত পাতা

 

বিষণ্ণ পাতার কাছে খোঁজ নিই ভুল ঠিকানার

অরণ্য একাই জানে কোন ঘাসে কার নাম লেখা;

পথের সীমানা শেষে শুরু হয় ঠিকানা জানার,

ঘন হতে থাকা এই গাছেদের কাছে সব শেখা।

 

কেউ কেউ ভুলে থাকে পাতাদের বিষাদ কাহিনি,

ঘাসের আদরে কেউ ভুলে যায় সব অপমান

শিকড়ের কাছে তার ঋণ বাড়ে, বাড়ে কিছু গ্লানি

পাতাদের ইহজন্ম, পরজন্ম সবই সমান।

 

অবসাদে ক্লান্তি বাড়ে, ঘুম আসে পাতার চোখেও

ঘুম এলে স্বপ্ন আসে, স্বপ্নে মেলে অমৃত হদিশ

বসন্তের ঝরা পাতা তুলে রাখে কোনও কোনও লোকেও

স্মৃতির সঞ্চয়ে থাকে মূল্যহীন পাতাদের বিষ।

 

প্রতিদিন বিষপান, আত্মঘাতী হই প্রতিদিন

শিকড় হিসাব রাখে, পাতাদের ছায়া জোড়া ঋণ।