Jobanউইঘুর সংগ্রামের প্রবাদপুরুষ: কারান্তরীণ লোকগায়ক

তুর্দি ঘোজা’র লেখা

উইঘুর সংগ্রামের প্রবাদপুরুষ: কারান্তরীণ লোকগায়ক

বিগত এক দশক ধরে চীন সরকার নিপীড়ন চালিয়ে আসছে ‘উইঘুর’ সম্প্রদায়ের উপর। এনজিও কিংবা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেও কাড়তে পারছে না আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ। ঠিক তখন শুধু সঙ্গীত দিয়ে আবদুরেহিম হেইত উইঘুরদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন, চীনকে আতঙ্কিত করে তুলেছেন এবং বিশ্বের নজরে এনেছেন উঘুরদের সংকটাপন্ন অবস্থাআবদুরেহিমকে নিয়ে লিখেছেন ‘ক্যাম্পেইন ফর উইঘুর’র চেয়ারম্যান তুর্দি ঘোজা। লেখাটি জবান’র পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন, মাইনুদ্দিন সেজান।


গত আগস্টে জাতিসংঘের ‘এন্টি ডিস্ক্রিমিনেশন প্যানেল’র একটি প্রতিবেদন বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তুর্কিভাষী মুসলিম উইঘুর জনগোষ্ঠীর দশ লাখ সদস্যকে জোর করে দেশের পশ্চিম জিনজিয়ানের ক্যাম্পগুলোতে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছে।

ভয়াবহ ব্যাপারটি প্রকাশ হওয়ার পর কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ  ধর্মীয়, মতপ্রকাশ ও সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ক্যাম্পগুলো বন্ধ করার জন্য চীনের প্রতি জোর দাবি জানায়। চীন সরকার কতৃক উইঘুর সম্প্রদায়ের উপর ভয়ংকর নিপীড়নের বিশদ বর্ণনা দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলো দেখে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উপর অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপের ব্যাপারেও চিন্তা ভাবনা করেছিল। যদিও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ যথারীতি জয় লাভ করে, বিশ্ব মনোযোগ মোড় নেয় অন্যদিকে। পুনরায় বিশ্ব সম্প্রদায় উইঘুরদের দুঃখকষ্টের ইতি টানতে গঠনমূলক কোন পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। প্রতিশোধমূলক কোন কার্যকরী হুমকির অভাবে চীন কতৃপক্ষ সমালোচনাগুলোর তোয়াক্কা না করে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম গোষ্ঠীর উপর নিষ্ঠুর আচরণ অব্যাহত রাখে। এমনকি তাদের এমন কর্মকাণ্ডকে ডিফেন্ড করে বলছে, “তাদের কার্যক্রমগুলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্ধারিত গতিপথেই রয়েছে”।

নির্বাসনে থাকা একজন উইঘুর অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে না, আমি বিস্মিত হয়েছি চীনের লজ্জাহীন অস্বীকার ও বৈধতা দেওয়ার চেষ্টায়, না আমি বিস্মিত হয়েছি বিশ্বের নিষ্ক্রিয় ভূমিকায়। একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আমি দশক ধরে চেষ্টা করছি উইঘুরদের করুণ দশা বিশ্বের নজরে আনার। খানিক সফলতাও হয়তো পেয়েছি। বহু বছর ধরে চীনকে জবাদিহিতার আওতায় আনতে বিশ্ব নেতাদের কনভেন্স করতে না পেরেছে এনজিওগুলোর প্রতিবেদন, না উইঘুরদের নিজেদের সাক্ষ্য প্রমাণ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোও অর্থহীন বিবৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়- চীন তার কার্যক্রম থেকে এক কদম পিছিয়েও আসেনি, আক্রমণাত্মক নীতি দিয়ে লক্ষ লক্ষ জীবনকে বরবাদ করে দেওয়ার কোন অনুশোচনাও প্রকাশ করেনি।

কিন্তু আশ্চর্যজনক কিছু একটা ঘটে গেছে গত মাসে।

জনপ্রিয় লোক কবি ও গায়ক আবদুরেহিম হেইত ডিটেনশন ক্যাম্পে মারা গেছেন এই খবরটি তুর্কি সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তুর্কিরা এই কবিকে ‘তুর্কি সম্পদ’ হিসেবে আখ্যা দেয়। জাতীয়তাবাদী তুর্কি জনগণের প্রতিক্রিয়া এত জোরালো আকার ধারণ করে করে যে, তুর্কি সরকার উইঘুরদের প্রতি চীনা আচরণের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে বিবৃতি প্রকাশ করে।

আংকারা’র এই বক্তব্যই উইঘুর সম্প্রদায়ের জন্য একটা নতুন আশার আলো। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশোধের ভয়ে অতীতে যেখানে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিই এই ইস্যুতে চীনের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে।

 

আংকারা’র এই বক্তব্যই উইঘুর সম্প্রদায়ের জন্য একটা নতুন আশার আলো। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশোধের ভয়ে অতীতে যেখানে অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিই এই ইস্যুতে চীনের সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছে।

এ বিবৃতি দেওয়ার পর যা ঘটেছে তা আরো গূরত্বপূর্ণ।

হেইত নিহত হওয়ার খবর অস্বীকার করে চীন। এমনকি উইঘুর গায়কের একটি ভিডিও রিলিজ করে। ২৫ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে হেইতকে বলতে দেখা যায়, “তিনি জাতীয় আইন ভঙের অভিযোগে একটি তদন্ত প্রক্রিয়ায় আছেন”। হেইত আরও বলেন, “তিনি সুস্থ আছেন, এবং তাকে লাঞ্চিত করা হয়নি”। অবশ্য এই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা বা হেইত ভালো আছেন এবং একটি স্বচ্ছ তদন্তের মুখোমুখি হচ্ছেন তা জানার কোন উপায় আমাদের নেই। ভিন্ন মতালম্বীদের উপর শক্তি প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি আদায়ের ইতিহাস চীনের রয়েছে।

তবু এই ভিডিও রিলিজ দেওয়া উইঘুরদের কষ্টভোগের ইতি টানার চেষ্টার একটি টার্নিং পয়েন্ট চিহ্নিত করে। এটা গৃহচ্যূত উইঘুরদের অনুপ্রেরণা যোগায় একটি সামাজিক গণমাধ্যম ক্যাম্পেইন শুরু করতে এবং তাদের আত্মীয়স্বজনও যে ভাল আছে তার প্রমাণাদি দেখানোর দাবিও চীনের কাছে তুলতে। চীনের ভিডিও রিলিজের সিদ্ধান্ত এবং অফিসিয়ালভাবে তুর্কি সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান প্রমাণ করে যে, বেইজিং আন্তর্জাতিক সমালোচনা পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেনি। উপরন্তু এটা প্রমাণ করে যে, ডিটেনশন ক্যাম্পে থেকেও বিশ্বনেতৃবৃন্দ ও চীন রাষ্ট্রের উপর অগণিত এনজিও এবং গণমাধ্যম সংগঠনগুলোর চেয়ে হেইত বেশি শক্তিশালী।

কে এই আবদুরেহিম? কেন তিনি চীনকে এত ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলেন?

একজন ফোক হিরো

হেইত একজন দোতারা গায়ক। দোতারা হচ্ছে দুই তার বিশিষ্ট একটি বাদ্যযন্ত্র। এটি  উইঘুর সংস্কৃতির একটি গূরত্বপূর্ণ উপাদান।

আমি যে গ্রামে বড় হয়েছি সেটি প্রাচীন সিল্ক রোডের শহর কাশগার থেকে ২০ মাইল পূর্বে। এ গ্রামে প্রত্যেক পরিবারে একটা দোতারা থাকে। আমাদেরও একটা ছিল। আমার মা এবং বড় বোন বাজাতে পারত। দুর্ভাগ্যবশত শিখতে গিয়ে সেটি আমি ভেঙে ফেলি। তাই আমার আর শেখা হয়নি।

উইঘুরের আপামর জনতার নায়ক আবদুরেহিম হেইত

যদিও আমি কখনো দোতারা বাজানো শিখতে পারিনি। তবু আমার শৈশব ঘিরে ছিল এই দোতারা। দোতারার শব্দ আমি সবসময় শুনতে পেতাম। যাদেরকে আমি চিনতাম সবাই হয় এটা বাজাতে পারত অথবা শুনে উপভোগ করত। যেহেতু আমাদের সব প্রিয় লোকগান এটা দিয়ে গাওয়া যেত। নানাভাবে দোতারা ছিল আমার মানুষ ও শৈশবের সুর।

গ্রাম ছেড়ে বেইজিংয়ে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর উইঘুর সঙ্গীত শোনা ত্যাগ করি। আমি কাশগারে যাদের সাথে আমি বড় হয়েছি তাদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে চেয়েছি। শহুরে মানুষের সাথে মেলামেশা শুরু করি। তাই পশ্চিমা সঙ্গীত শোনা শুরু করি। আমার সংস্কৃতির সৌন্দর্য ও অনন্যতার কদর জানতাম না বলে আমি কোথা থেকে এসেছি এটা লুকাতে চাইতাম।

আমার অগোচরে আবদুরেহিম নামে এক দোতারাবাদক উইঘুর সঙ্গীতে ভাল জনপ্রিয়তা পায়। আমার পরিবারসহ সবাই শুধু তার ক্যাসেট শুনত এবং দোতারায় তার গানের সুর তুলত। তার গানকে এড়িয়ে চলা অসম্ভব ছিল। রাতারাতি তার সুরগুলো ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়ে যায়। যেকোন সামাজিক অনুষ্ঠানেই তার গানগুলো বাজানো হত।

১৯৯৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন করার জন্য আমি আমেরিকায় চলে আসি। এখানে এসে উইঘুর সঙ্গীতের সাথে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। একবছর পর তিনদিনের জন্য উইঘুরে আসলে দোতারার সুর আর হেইতের গলা আবার শুনতে পাই । অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই সে উইঘুর জনগণের ফোক হিরো হয়ে ওঠে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি পরিচিত মুখ  

গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর আমি স্বনামধন্য একটি রিসার্চ ইন্সটিটিউটে চাকরি পাই। আমেরিকায় ভাল সুযোগ সুবিধার জন্য আমেরিকায় সেটলড হই। স্বপ্ন দেখি অনেক টাকা আয় করে মাকে ঘুরাতে নিয়ে আসব। চাকরির তিনমাসের মাথায় সে স্বপ্নগুলো ত্যাগ করতে হয়।

১৯৯৭ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি, আমেরিকার নিউজ চ্যানেলগুলোতে প্রথমবারের মত আমি  আমার জনগণকে দেখতে পাই। চীন সরকার কতৃক ‘মেশরেফ’ নামক একটি উইঘুর সাংস্কৃতিক আসরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে উইঘুররা রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ দমনের জন্য সরকার সেনা মোতায়েন করে। এতে অনেক তরুণ প্রাণ হারায়।

টিভিতে ভায়োলেন্ট ক্র্যাকডাউনের উপর প্রতিবেদনগুলো দেখে আমি লক্ষ্য করি, বেশিরভাগ প্রতিবাদকারী আমার মতই তরুণ। আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য যেখানে তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে সেখানে আমি নীরব থাকতে পারি না। এই সিদ্ধান্ত আমি নিই। আমেরিকায় উইঘুরদের যে সামান্য কয়জন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে তাদের একজন হিসেবে আমার অনুভূত হয়েছে কথা বলা এবং আমাদের জনগণের অবস্থা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে আনা আমার একটা দায়িত্ব।

 

টিভিতে ভায়োলেন্ট ক্র্যাকডাউনের উপর প্রতিবেদনগুলো দেখে আমি লক্ষ্য করি, বেশিরভাগ প্রতিবাদকারী আমার মতই তরুণ। আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য যেখানে তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে সেখানে আমি নীরব থাকতে পারি না। এই সিদ্ধান্ত আমি নিই। আমেরিকায় উইঘুরদের যে সামান্য কয়জন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে তাদের একজন হিসেবে আমার অনুভূত হয়েছে কথা বলা এবং আমাদের জনগণের অবস্থা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে আনা আমার একটা দায়িত্ব।

এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া কঠিন ছিল। আমি জানতাম, আমি যদি আওয়াজ তুলি তাহলে হয়ত আমার মা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে আমি কখনো দেখতে বাড়ি যেতে পারব না। পাশাপাশি এটাও জানি উইঘুরের সেসব তরুণদের তুলনায় সরকারের বুলেট থেকে আমেরিকায় আমি নিরাপদে আছি। তো আমি অল্প সংখ্যক কিছু উইঘুর আর আমার আমেরিকার বন্ধুদের নিয়ে একটা প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করি। যাতে বিশ্বকে ঘুলজা গণহত্যা ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জানাতে পারি। চীনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলার মধ্য দিয়ে আমি কার্যত হত্যা করি আমার মাকে আবার দেখার সুযোগ। আমি একজন অ্যাক্টিভিস্ট হওয়ার কারণে আমার মা কখনো পাসপোর্ট পাবে না আর আমিও দেশে যেতে পারব না। এমনকি ফোনে কথা বলার সময়েও আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হয়।

আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও, বিশ্ব খুব দ্রুত ঘুলজা গণহত্যার কথা ভুলে যায়। এরপর আমেরিকার গণমাধ্যমে আমার জনগণের আর কোন খবর আমি পড়িনি বা শুনিনি।

দু’বছর পর ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস পেইজে হঠাত আমি আবদুরেহিম হেইতের ছবি দেখতে পাই। ‘ইন এ ফার ফ্লাং কর্নার অব চায়না’ শিরোনামে ফিচার আর্টিক্যালটি প্রকাশিত হয়। আমাদের জনগণের উপর যে নিপীড়ন চীন সরকার চালায় তার বর্ননা দিয়ে গান গাওয়ার কারণে আবদুরেহিম সরকারের হাতে যে লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন তার বর্ণনা এই আর্টিকেল। চীনের বাহিরে কোন বড় প্রকাশনায় এই প্রথম উইঘুর শিল্পী নিয়ে ফিচার। তিন বছর পর মার্চ ২০০২ সংস্করণে টাইমস ম্যাগাজিনও তাকে নিয়ে ফিচার করে। এই আর্টিক্যালে গানে গানে সামাজিক বার্তা দেওয়ার কারণে হেইতকে আমেরিকার বিখ্যাত গায়ক বব ডিলানের সাথে তাকে তুলনা করে তার শৈল্পিক প্রতিভার উচ্চ প্রশংসা করে।

আর্টিক্যালটি পড়ে তাকে নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি। কিন্তু একই সময়ে জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময়ে তার গান এবং উইঘুর সঙ্গীতকে অবহেলা করার কারণে খারাপ লাগা কাজ করে। তদুপরি, হেইতের কবিতার অর্থের গভীরতা নিয়ে আমেরিকান লেখকদের প্রশংসা পড়ে আমি বুঝতে পারি যে, এতগুলো বছর আমি তার গানের কথায় মনোযোগ দেইনি।

আমি দ্বিতীয়বার তার সঙ্গীত শোনার সিদ্ধান্ত নিই। একটি ভিসিডিতে তার করা পারফরম্যান্সগুলো পাই। মঞ্চে তার উপস্থিতি, কম্পোজিশনের সৌন্দর্য সব কিছু ছাপিয়ে তার গানের লিরিকে চীনা শাসনে উইঘুরদের দৈনন্দিন দুঃখ কষ্টের প্রতিফলন আমাকে অভিভূত করে। যদিও আমেরিকান মিডিয়ার মাধ্যমে আমি এই ফোক হিরোকে পুনঃআবিস্কার করে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করি, তবুও আমার মা এবং আত্বীয়স্বজন কেন তাকে এত ভালবাসে অবশেষে তা অনুধাবন করতে পেরে খুশিও হই। সম্ভবত আমার সংস্কৃতিকে বোঝা ও আলিঙ্গন করার মত যথেষ্ঠ পরিপক্ক হই। উইঘুরে যেমনিভাবে একটি কথা প্রচলিত, ফল যখন পাঁকে তখন শিকড়েই ফিরে আসে।

তিনি শুধু একজন লোকগায়কই নন, সামনের কাতারে দাঁড়ানো একজন জেনারেলও

হেইত একজন সুপারস্টার। সারাবিশ্বে তার ভক্ত ও অনুসারী রয়েছে। অথচ গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ উইঘুরের মতই জীবনযাপন করতেন। খ্যাতির কারণে অন্যান্য অনেক গায়ক ও সংগীতজ্ঞের মত তিনি তার পথচ্যূত হননি। বছরের পর বছর ধরে সত্যের উপর অবিচল ছিলেন। সরকার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চালালেও তিনি গানে গানে বলে যেতে থাকেন উইঘুরদের জীবনধারণ।

২০১৭ সালে একবার তিনি ‘বাবা’ নামে একটি গান করেন। যার কথাগুলো নেওয়া হয়েছে একটি উইঘুর কবিতা থেকে। কবিতাটিতে তরুণ প্রজন্ম পূর্বে যারা ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছেন সম্মানের সহিত স্বরণ তাদের করে। গানটি গাওয়ার কারণে চীনা সরকার তাকে ‘সন্ত্রাসী হুমকি’ মনে করে জেলে পাঠায়। 

 

একবার তাকে চীন জুড়ে সম্মান জানানো হয়। জাতীয় শিল্পী কলাকুশলিদের সাথে সারাদেশে তিনি পারফরম্যান্স করেন। ২০১৭ সালে একবার তিনি ‘বাবা’ নামে একটি গান করেন। যার কথাগুলো নেওয়া হয়েছে একটি উইঘুর কবিতা থেকে। কবিতাটিতে তরুণ প্রজন্ম পূর্বে যারা ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছেন সম্মানের সহিত স্বরণ তাদের করে। গানটি গাওয়ার কারণে চীনা সরকার তাকে ‘সন্ত্রাসী হুমকি’ মনে করে জেলে পাঠায়।

তিনি কারাগারে থেকেও নিজেদের পরিচয় সংরক্ষণের জন্য এক অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত সকল উইঘুর জনগণের একজন ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠেন। আবদুরেহিম শুধু একজন লোকগানের তারকাই নন। তিনি তার জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শক্তিশালী এক শত্রুর বিরুদ্ধে সামনের কাতারে দাড়ানো একজন জেনারেলও।

চীন বহু বছর ধরে উইঘুরদের তরুণদের নিজেদের পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ তৈরি করার মাধ্যমে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে গেঁয়ো বা অসুন্দর বানানোর চেষ্টা করছে। ‘পুনরায় শিক্ষিত করা’র নাম দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো চালানো উইঘুর পরিচয়ের সকল আলামত মুছে দেওয়ার অশুভ পরিকল্পনার আরেকটি অধ্যায়। তথাপি, আবদুরেহিমের মত উইঘুর শিল্পী, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তকদের কারণে তাদের এই ক্যাম্পেইন ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।

হাজার মাইল দূরে আমেরিকা থেকেও আমার সংস্কৃতিকে পুনরায় অনুধাবন ও উইঘুর ঐতিহ্যকে নিয়ে গর্ব করার স্পৃহা হেইত আমার ভিতরে গড়ে দিয়েছে। আমি জানি উইঘুর এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অনেক মানুষকেও তিনি এমন করে অনুপ্রাণিত করেছেন। হেইত এবং অন্যান্যরা তাদের শিল্প এবং চিন্তা দিয়ে সকল উইঘুরদের ঐক্যবদ্ধ করছেন। তারা ক্ষমতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশ্বের মনোযোগ আমাদের করুণ অবস্থার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছেন। আমাদের সংস্কৃতির অস্তিত্ব তাদের কাঁধের উপর ভর করে আছে।

চীনও এ বিষয়ে সচেতন আছে। সে কারণে চীন রাষ্ট্র হেইত’র মত অনেক উইঘুর বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, গীতিকার, লেখক এমনকি খেলোয়াড়দেরও কিছু ঠুনকো অভিযোগে আটকে রেখেছে।

যাই হোক, গত মাসের নানা ঘটনা প্রমাণ করে যে, হেইত চীনের চেয়েও শক্তিশালী। কারাগারের প্রকোষ্ঠে থেকেও যেখানে তার কথা বলার উপায় নেই, অনবরত তিনি উইঘুর লড়াইয়ে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন।

হেইত’র শিল্পের কারণে তুর্কি সরকার উইঘুর জনগণের জন্য আওয়াজ তুলেছে। আমি জানি অনাগত দিনে তার মনোমুগ্ধকর শিল্প আমাদের জন্য আরো অনেক কিছু বয়ে নিয়ে আসবে। চীন সরকার যদি তাকে মুক্তি নাও দেয়, তবুও।